হেপাটাইটিস নির্মূলে গণসচেতনতা প্রয়োজন 

:
স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। জীবনকে সফল করার প্রথম শক্তি স্বাস্থ্য। বর্তমান সময়ে সারাবিশ্বে ভয়ঙ্কর এক নাম নভেল করোনাভাইরাস। এর সংক্রামণে মানুষ কে করছে নাজেহাল আর মৃত্যুর মিছিল করছে বড়। করোনার এ সময়ে আমরা প্রায় ভুলেই গেছি অন্যান্য  মরণব্যধির ভাইরাসের কথা। ভাইরাস একটি লাতিন শব্দ, যার  অর্থ বিষ।  আদিমকালে রোগ সৃষ্টিকারী সব বিষাক্ত পদার্থকেই ভাইরাস বলা হয়। ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখা যায় ভাইরাস ধূলিকণার চেয়েও অনেক ছোট। আমাদের চোখের সামনে অসংখ্য ভাইরাস ভেসে বেড়ালেও আমরা দেখতে পারি না। একটি অকোষীয় আণুবীক্ষণিক জৈব কণা  কালেকালে পুরো বিশ্বকে আতঙ্কিত করছে এবং কোটি কোটি জীবন কেড়ে নিচ্ছে। ভাইরাসের দেহের বাইরে একটি প্রোটিন আবরণ থাকে। ভেতরে নিউক্লিক এসিড বা আরএনএ থাকে। এটি অকোষীয় বস্তু। কোষের বাইরে অর্থাৎ প্রাণি কিংবা উদ্ভিদের শরীরে প্রবেশের আগে এর কোনো ক্ষমতা নেই। কোষের ভেতর ঢুকলেই এটি গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে। মুহূর্তেই সজীব কোষকে আক্রমণ করে, তখনই প্রাণ ফিরে পায় ভাইরাস। তেমনি এক  পঞ্চ ভাইরাস। হেপাটাইটিস ‘ এ ‘ হেপাটাইটিস ‘ বি ‘ হেপাটাইটিস ‘ সি’ হেপাটাইটিস ‘ ডি’  হেপাটাইটিস ‘ ই ‘
প্রতি বছর ২৮ জুলাই বিশ্বব্যাপী হেপাটাইটিস দিবস পালিত হয় ৷ ২০০৪ সালের ১ অক্টোবর প্রথম ‘আন্তর্জাতিক হেপাটাইটিস সি সচেতনতা দিবস’ পালন শুরু করেন। আমাদের দেশে ২০১১ সালে প্রথমবারের মতো এই দিনটি পালিত হয়। হেপাটাইটিস শব্দটি এসেছে প্রাচীন গ্রীক শব্দ “হিপার ” যার অর্থ লিভার এবং ল্যাটিন শব্দ আইটিস যার অর্থ প্রদাহ, অর্থাৎ হেপাটাইটিস বলতে বুঝায় লিভার কোষের গঠনগত পরিবর্তন ও প্রদাহ ।
হেপাটাইটিস হচ্ছে যকৃতের প্রদাহ। অর্থাৎ যকৃত ফুলে যাওয়া বোঝায়। ভাইরাস ঘটিত সংক্রমণ বা অ্যালকোহলের মত ক্ষতিকারক পদার্থের কারণে ঘটা যকৃতের একটি রোগ। হেপাটাইটিস অল্প কিছু উপসর্গসহ বা কোনো উপসর্গ ছাড়াই ঘটতে পারে। তবে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে জন্ডিস, ক্ষুধমান্দ্য ও অসুস্থতাবোধ এর লক্ষণ বা উপসর্গ।মানবদেহে দুধরণের হেপাটাইটিস দেখা যায় : তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী। তীব্র হেপাটাইটিস ৬ মাসেরও কম স্থায়ী হয়, অন্য দিকে দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস দীর্ঘ দিন ধরে চলতে থাকে। মূলত হেপাটাইটিস ভাইরাসের কারণে এই রোগটির সূত্রপাত, তাছাড়া অ্যালকোহল, নির্দিষ্ট কতগুলো ওষুধ, শিল্প-জৈব দ্রাবক এবং উদ্ভিদের টক্সিক জাতীয় পদার্থের কারণে এই রোগটি ঘটে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দেশে প্রায় এক কোটি মানুষের বিভিন্ন টাইপের হেপাটাইটিস থাকলেও ৯০ শতাংশই তা জানতে পারেন না। যারা জানতে পারেন তাদের ও চিকিৎসা সুবিধা বাংলাদেশে খুবই কম। বাংলাদেশের প্রায় পাঁচ কোটি লিভার রোগীর চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ১০০ জন, যাদের বেশিরভাগই ঢাকার। ফলে সারা দেশে লিভার রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসা অনেকটাই দুরূহ।
মানবজাতি অতীতে  যখন মহামারীতে আক্রান্ত হত তখন মানুষের কোন ধারণাই ছিল না কী কারণে মানুষ মরে যাচ্ছে, মানুষ জানত না কিভাবে মহামারী থামাতে হয়। তাঁরা সাধারণত মহামারীর জন্য দায়ী করত অদৃশ্য  কোনো শক্তিকে।
মহামারি তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, ১৬ শতকের সময়ে আমেরিকা, অ্যাজটেক, মায়া, ইনকা অঞ্চলের ৯০ শতাংশ অধিবাসী মারা যায় গুটিবসন্ত এবং অন্যান্য মহামারীতে তখনকার মানুষের কাছেও কোন ধারণা ছিল না কেন লাখে লাখে মানুষ মারা যাচ্ছে। কিন্তু  কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই বিজ্ঞানীরা চিহ্নিত করেছেন নোভেল ভাইরাসের কারণে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। সেই সাথে ভাইরাসের জিনোম সিক্যুয়েন্স বের করতে সক্ষম হয়েছেন এবং আক্রান্ত রোগীকে শনাক্ত করতে সক্ষম হচ্ছে। করোনা সংক্রামণ রোধেও টিকা আবিষ্কার হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পৃথিবীব্যাপী প্রায় দুই বিলিয়ন মানুষ হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত। মোট আক্রান্তের ২৭ মিলিয়ন। মোট আক্রান্তের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ তাঁদের রোগ সম্পর্কে অবগত নন।
প্রতিবছর প্রায় ৬ লাখ মানুষ দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস-বি সংক্রমণজনিত জটিলতায় মৃত্যুবরণ করে। হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের ফলে ২৫ শতাংশের লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যানসারে মারা যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। আমাদের দেশে প্রায় ৫ কোটি লিভার রোগীর জন্য মাত্র ১০০ জন লিভার বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। যা খুবই আশঙ্কাজনক। এসব রোগের মাঝে ফ্যাটি লিভারের প্রাদুর্ভাব বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। বর্তমানে দেশের বেশিরভাগ মানুষ ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকিতে রয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে প্রতি ৪ জনে ১ জন ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত।
হেপাটাইটিস এক শরীর থেকে অন্য শরীরে রোগের সংক্রমণ ঘটায়। এজন্য সঠিক পদ্ধতিতে ব্লাড ট্রান্সমিশন করা, অনিরাপদ দৈহিক সম্পর্ক থেকে বিরত থাকা, অন্যের ব্যবহৃত সূঁচ ও ব্লেড ব্যবহার না করা। এইচবিএস-এজি ও এন্টি-এইচসিভি  পরীক্ষা বিনা মূল্যে করতে হবে। গর্ভকালীন, অস্ত্রোপচার, ডায়ালাইসিস ও রক্ত বা রক্তজাত দ্রব্য গ্রহণের আগে হেপাটাইটিস পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।  জন্মের পরপরই শিশুকে হেপাটাইটিস ‘বি’-এর টিকাদান নিশ্চিত করা। স্বাস্থ্য সুরক্ষা’ কর্মসূচির আওতায় দরিদ্র প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বিনা মূল্যে হেপাটাইটিস ‘বি’ ও হেপাটাইটিস ‘সি’-এর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। পর্যাপ্ত লিভার বিশেষজ্ঞ তৈরির জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা এবং করোনার মধ্যেও হেপাটাইটিসের চিকিৎসা অব্যাহত রাখা। ফলে জীবাণুর সাথে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করতে হলে যেমন জীবাণু সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করা ঠিক তেমনি রোগনির্ণয়, প্রতিরোধ ও প্রতিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা একান্ত প্রয়োজন।
লেখক: রাশেদ ইসলাম,  শিক্ষার্থী, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ,জয়পুরহাট সরকারি কলেজ।