সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বন্ধ করতে হবে

:
শোষনমুক্ত ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র  গড়ার প্রত্যয় নিয়ে দেশের বীর সৈনিকেরা রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা এনে ‌দি‌‌য়ে‌ছিল। বাঙালি জাতি যে অসাম্প্রদায়িক‌ ‌চেতনার জাতি তার প্রমাণ মহান মুক্তিযুদ্ধ। কারণ সকল ধর্মের মানুষ মুক্তির জন্য রাজপথে “জয় বাংলা ” স্লোগান তুলেছিলেন। কিন্তু আজ বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠছে বাতাস। একের পর এক সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা, হামলা ও লুণ্ঠনের ঘটনা বিরতিহীন ভাবে ঘটেই চলছে। সারা‌দে‌শে সংখ‌্যালঘুরা রাজপ‌থে এ‌‌সে রা‌ষ্ট্রের কা‌ছে প্রশ্ন তুল‌‌ছে তাঁরা কি নিরাপদ? ফ‌লে তা‌দের জীবন নি‌য়ে শঙ্কিত। রাস্তায় মানববন্ধন, মি‌ছিল, ‌বি‌ক্ষোভ সমা‌বেশ ও গণতান্ত্রিক ধারায় আ‌ন্দোলন ক‌রে আস‌ছে কিন্তু তা‌দের দা‌বি গু‌লো কেন নেওয়া হ‌চ্ছে না।
আমরা যদি তিনটি ‘প’ এর বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাবো প্রশ্রয়, পৃষ্ঠপোষতা ও  প্রশাসনের সহায়তার কারণে সাম্প্রদায়িক হামলা, সংখ্যালঘু নির্যাতন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা, জায়গা-জমি দখল করার মত অসাংবিধানিক কাজ গুলো সুশিক্ষা অভাবে হচ্ছে। তাহলে স্বাভাবিক ভাবে  প্রশ্ন  করা যায় যে, কাদের প্রশ্রয়ে এমন ঘটনা ঘটছে?ফেসবুকে ভুয়া একাউন্ট থেকে মিথ্যা প্রচারের ঘটনা প্রমাণিত হওয়ার পরও অপরাধীদের শাস্তি হয় না বরং মিথ্যা অভিযোগে দিনের পর দিন কারবরণ করছে। তার প্রমাণ গত মার্চে সুনামগঞ্জের শাল্লায় ঝুমন দাশ নামের এক ব্যক্তির ফেসবুকে উসকানিমূলক স্ট্যাটাস বলে গুজব ছড়িয়ে তাকে গ্রেফতার করেছেন প্রশাসন। অপর দিকে নোয়াগাঁও গ্রামের সংখ্যালঘুদের শতাধিক বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। কেন ঘটল? স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশ জ্ঞান-বিজ্ঞানে অনেকটাই হয়তো এগিয়েছে, কিন্তু সভ্যতায়, সমাজ বিনির্মাণে, মানুষের জানমালের নিরাপত্তায়  কত টা এগিয়ে‌ছে? সাম্প্রদায়িক বিশৃঙ্খলা বলে দিচ্ছে কোন পথে যাচ্ছে দেশ।
২০১২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বরে রামুতে বৌদ্ধ পল্লীতে হামলার ঘটনা ঘটার প্রায় নয় বছর পার হলেও কোন বিচার এখনও হয়নি। উত্তম বড়ুয়ার নামে ফেসবুক পোস্টের অজুহাতে রামু, উখিয়া এবং টেকনাফে তাণ্ডব চালানো হয়েছিল তিনি জামিন পেলেও এখন নিখোঁজ রয়েছেন৷ যদিও তদন্তে তার ফেসবুক পোস্টের কোনো প্রমাণ মেলেনি৷ ২০১৩ সালে পাবনার সাঁথিয়া হামলা।
২০১৬ সালের ২৯ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু বসতিতে হামলার তদন্ত প্রায় পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি৷ ওই সময় যাদের আটক করা হয়েছিল তারাও জামিনে মুক্ত৷ অন্যদিকে লেখাপড়া না জানা যে রসরাজের ফেসবুক পোস্টের ধর্মীয় অবমাননার কথা তুলে হামলা হয়েছিল তাকেই উল্টো দীর্ঘদিন জেলে থাকতে হয়েছে। ২০১৭ সালের নভেম্বরে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হয় রংপুরের গঙ্গাচড়ার ঠাকুরপাড়ায়। ২০২০ ভোলার মনপুরায় হামলা, ২০২১ সুনামগঞ্জের শাল্লা আলোচিত   ঘটনা শেষ হতে না হতেই এর মধ্যেও সম্প্রতি খুলনার রূপসা উপজেলার শিয়ালী গ্রামের ১০টি সংখ্যালঘুদের দোকান ভাঙচুর করে এবং বেশ কয়েকটি বাড়িতে হামলা চালিয়ে লুটপাট করা হয়। এছাড়াও গোবিন্দ মন্দির, শিয়ালী পূর্বপাড়া হরি মন্দির, শিয়ালী পূর্বপাড়া দুর্গা মন্দির, শিয়ালী মহাশ্মশান মন্দিরের বেশিরভাগ প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়। এ সময় কয়েকজন বাধা দিতে গেলে তাদের পিটিয়ে আহত করা হয় বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।২০০৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দেশে এক হাজার ৭১৪টি মন্দির ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৩০২ জন হত্যা এবং ৩৯২ জন ধর্ষণের শিকার হন। এর শেষ কোথায়? আমাদের দেশের সংখ্যালঘুরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। কারণ তারা আইনি, রাজনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের শিকার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্মমভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে। এর শেষ কোথায়? রাষ্ট্রের দায়িত্ব কি?
 আমাদের দেশে যত দিন যাচ্ছে শিক্ষিতদের সংখ্যা বাড়ছে তবে অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ কতটুকু তৈরী হচ্ছে তা ভেবে দেখার বিষয়।  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে শিক্ষিতদের বক্তব্য অথবা অনেকের নিরবতা দেখে বুঝায় যায় তারা সাম্প্রদায়িক মনোভাবে আছন্ন। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে সাম্প্রদায়িকতা নিরসন করা সম্ভব হয়‌নি। ফলে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে কিভাবে অসাম্প্রদায়িক শিক্ষাব্যবস্থা  গঠন করা যায় তা মাথায় রাখতে হবে। অব্যাহতভাবে চলে আসা সাম্প্রদায়িক সহিংসতা জানান দিচ্ছে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় অসাম্প্রদা‌য়িক শিক্ষার অভাব কতটুকু। শিক্ষাব্যবস্থা এ ক্ষেত্রে ঠিক কী করতে পারে? প্রত্যেক মানুষের জীবনে পরিবারের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই মানু‌ষের জীবন গড়ে তোলে। বিদ্যালয়ে ভর্তির পর শিক্ষার্থীদের জীবনের অর্ধেকটা সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাটিয়ে দেয়। ফলে  সৎ গুণাবলী বিকাশে জন্য তাদের প্রতিষ্ঠান হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। ছোটকাল থেকে যদি অসাম্প্রদায়িক চেতনায় গড়ে উঠে তাহলে তার ছাপ থাকবে সারাটি জীবন এবং তা ছড়িয়ে পড়বে পরিবাবর,সমাজ ও রাষ্ট্রে। ফলে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষাক্রমে বিষয়টি কেন্দ্র করে কিছু বাড়তি পদক্ষেপ নিতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে যদি কিছু বিষয়বস্তু তুলে ধরে পাঠদান করা হয় তাহলে শিক্ষার্থীদের বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ দূর করা সম্ভব হবে।যার মধ্য দিয়ে সমাজে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একে অন্যের ধর্মের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তুলবে। শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে বিষয়বস্তু গুলো শিক্ষকদের ভালোভাবে বুঝিয়ে  দিতে হবে।পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অন্যান্য কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
সমাজ থেকে সাম্প্রদায়িকতা দূরীকরণে নেতৃত্ব দিতে শিক্ষাখাতের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা যাতে আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে সে জন্য প্রশাসন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।সংখ্যালঘু নির্যাতনের যে কোনো ঘটনা ঘটুক না কেন আর অপরাধী যেই হোক না কেন দ্রুত গ্রেপ্তারসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে হাজার বছরের অতি কষ্টে অর্জিত সম্প্রীতি চেতনা যেন কুচক্রী মহল দ্বারা বিনষ্ট না হয় তার জন্য সজাগ থাকতে হবে। ইতিহাস, ঐতিহ্যে, সংস্কৃতি ও সংগ্রামে গড়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যেন বিলুপ্তির না হয়।
লেখকঃ রাশেদ ইসলাম, শিক্ষার্থী, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ জয়পুরহাট সরকারি কলেজ।