মিউজিক ছেড়ে ইসলামের পথে আসার গল্প জুনায়েদ জামশেদের

সাইফুল্লাহঃ
মিউজিক ছেড়ে দিয়েছিলাম,তারপর ভাবতাম কি করবো,কি কাজ করবো…?
এক পর্যায়ে আমার অবস্থা এমন হলো যে,আমি আমার শেষ ১০০ রুপি বের করে আমার স্ত্রীকে দিয়ে দিলাম।তাকে বললাম, আগামীকাল থেকে আর কিছু চাইবে না, এখন আমার কাছে দেয়ার মত আর কিছু নাই।
আমার অবস্থা এমন হয়ে গেছিলো, উপরে আল্লাহ ছাড়া সেই মূহুর্তে আর কোন সহায় ছিলো না।
আমি মাওলানা তারিক জামিল সাহেবের কাছে একবার একটা হাদীস শুনেছিলাম,
-যদি তুমি আল্লাহর জন্য কোন কিছু ছেড়ে দাও,আল্লাহ তোমাকে এর চাইতে অনেক গুন বেশী দিবে।
এই হাদীসের শব্দ গুলো আমার মাথায় গেঁথে গিয়েছিল, আবার হতাশ হয়ে মাঝে মধ্যে চিন্তা করতাম আসলেই কি সু সময় আসবে?
পরক্ষনেই মাথায় আসতো,  আল্লাহর নবীর কথা তো মিথ্যা হতে পারে না।
২০০২ সালের কথা বলছি, একদিন আমি মসজিদে বসে আছি, একজন ব্যক্তি এলেন আমার কাছে। উনি জিজ্ঞাসা করলেন ; ভাই তুমি বর্তমানে কি করছো?
আমি উত্তর দিলাম,বর্তমানে কিছুই করছি না।
উনি আমাকে বললেন, চলো আমরা কাপড়ের ব্যবসা শুরু করি পার্টানারে। আমি ২৫ লাখ দিবো,আর তুমি দিবে ২৫ লাখ।
আমি রাজি হয়ে গেলাম। বাসায় এসে চিন্তা করছিলাম, আরে আমি যে রাজি হয়ে গেলাম এখন এই টাকা পাবো কোথায়?
মাথায় সারাদিন ঘুরতো,কি বিক্রি করবো, কার কাছে চাইবো। অবশেষে আমি পৈত্রিক জমি বিক্রি করে টাকা জোগাড় করে আমার পার্টানকে দিলাম।
আমরা কাপড় ক্রয় করলাম, রোজা এবং ঈদ টার্গেট করে সেগুলো দিয়ে জামা বানালাম।
কিন্তু আবারো আল্লাহর পরীক্ষায় পতিত হলাম।আমরা যেসব জামা বানিয়েছি সব গুলো জামার সাইজ এবং প্যার্টান ছোট বানিয়ে ফেলি। পাকিস্তানের বাজারে এই সাইজের জামা কেউ কিনতে চাইলো না।
মসজিদে এসে আল্লাহর কাছে সেজদায় গিয়ে জিজ্ঞাসা করতাম, কি ভুল হয়েছে আল্লাহ?
আল্লাহ জবাব দিলেন অন্যভাবে ; একদিন পাকিস্তানের রাস্তায় আমি আর আমার পার্টনার কাপড় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, মানুষকে ডাকছি আমাদের ড্রেস গুলো কিনতে।
হঠাৎ দেখলাম, একজন বাংলাদেশী ব্যবসায়ী এসে আমাদের বললেন, আমার কিছু ছোট সাইজের সেলোয়ার আর কামিজ চাই। তোমরা ব্যবস্থা করে দিতে পারবে?
পাকিস্তানের বাজারে সব ড্রেস পাকিস্তানের মেয়েদের লম্বা অনুযায়ী বানানো হয়।আর বাংলাদেশের মেয়েরা কিছুটা শর্ট,তাই আমার ছোট সাইজের সেলোয়ার-কামিজ প্রয়োজন!
আমি আর আমার পার্টনার অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম কিছুক্ষন। আর আল্লাহর রাজিক কার কিভাবে নির্ধারিত হয়ে যায় তা সেদিন চিন্তা করছিলাম।
ঐ বাংলাদেশী ভাই আমাদের সব গুলো ড্রেস এক লটে কিনে নিয়ে গেলেন।
এতক্ষণ বলছিলাম,পাকিস্তানের এক সময়ের জনপ্রিয় ব্যান্ড শিল্পী জুনায়েদ জামসেদের গল্প।গল্পটি শুনেছি উনার এক লেকচার থেকে। যিনি মাওলানা তারিক জামিল সাহেবের দাওয়াত পেয়ে মিউজিক ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় চলে এসেছিলেন।যশ,খ্যাতি,প্রাচুর্য সব পিছনে ফেলে একদম শূন্য হয়ে গেছিলেন। সেই জুনায়েদ জামসেদের হাত ধরেই পাকিস্তানে “খাদি” কাপড়ের ড্রেসের বিপ্লব শুরু হয়।মিউজিক ছেড়ে শেষ ১০০ রুপি স্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়া জুনায়েদ জামসেদের কাপড় তৈরির গার্মেন্টসে এক সময় কাজ করতো ১০ হাজার মানুষ।
করাচীতে সব চাইতে জনপ্রিয় কাপড়ের দোকান হয়ে উঠে জুনায়েদর ফ্যাশন হাউজ।
জুনায়েদ বলতেন, আমি মেয়েদের ড্রেস বানাই, কিন্তু মেয়েদের কোনদিন পন্য বিক্রির জন্য মডেল বানিয়ে বিজ্ঞাপন দিতাম না। মেয়েদের ছবি এতটা মূল্যহীন নয় যে,আমরা মেয়েদের ছবি ব্যবহার করে পন্য বিক্রি করবো।
রিজিকদাতা হলেন আল্লাহ, কোন মেয়ে,মডেল বা অভিনেত্রী নয়।
আমার মনে হতো, আমার ব্যবসায় আমরা দুইজন পার্টনার ছাড়াও তৃতীয় অংশীদার ছিলেন স্বয়ং আল্লাহ।
আমার মনে হয়, আল্লাহ চান তার বান্দা আগে ঠিক হয়ে যাক, সহী লাইনে আসুক; তারপর উনি দায়িত্ব নিয়ে সেই বান্দার রিজিক ঠিক করবার দায়িত্ব নিয়ে নেন।
মনে রাখবেন, আল্লাহ নিজেই তো ঘোষণা দিয়েছেন;
” আর যে আল্লাহকে ভয় করে,আল্লাহ তার জন্য নিস্কতির পথ বের করে দিবেন, এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিজিক দিবেন।”
পাকিস্তানের তরুন সমাজের চিন্তার জগতে আলোড়ন তোলা জুনায়েদ জামসেদ ২০১৬ সালে বিমান দূর্ঘটনায় ইন্তেকাল করেন।যার গজল এখনো মুগ্ধ হয়ে শুনি।