পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বৈষম্যের যাতাকলে  আদিবাসীরা 

:
মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কটা যুদ্ধক্ষেত্র কারণ প্রকৃতি সঙ্গে লড়াই করে মানুষ এই ডিজিটালাইজেশন বিশ্বায়নে এসেছে। মানুষ গাছ কেটে ঘরবাড়ি আর পাহাড় কেটে রাস্তা ঘাট অথবা নদীতে বাঁধ বানিয়ে নতুন সূচনা করেছিল। তবে প্রকৃতি বিজ্ঞানী ডারউইনের ‘যোগ্যতমের টিকে থাকা’ তত্ত্বের ভিত্তিতে বলাই যায় যে সব প্রাণি প্রকৃতি বা তাদের গোত্রের সঙ্গে লড়াই বা সংগ্রাম করতে পেরেছে তাদের অস্তিত্ব পৃথিবীতে টিকে আছে। আর সেই সংগ্রামী জাতি হিসাবে আদিবাসীরা  টিকে আছে তাদের সংগ্রামের বিনিময়ে। সবার ভাগ্যের পরিবর্তন হলেও তাদের অবস্থা এখন জুম চাষের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কারণ তাদের মানবিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ভৌত এবং প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থার  পিরামিডের তলানিতেই রয়েছেন।
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ৯ আগস্ট। বিশ্বের ৯০টি দেশের ৩০ থেকে ৩৫ কোটি মানুষ আদিবাসী দিবস উদযাপন করে থাকেন। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবস টি পালিত হয়। এই দিনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অধিকারবঞ্চিত আদিবাসীরা তাদের অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথে আসেন এবং তাদের দাবি তুলেন। করোনাকালে নতুন করে আবারও সংখ্যালঘু জাতিসত্তার মানুষ নানা সমস্যায় জর্জরিত।তাদের অসংখ্য মানুষ কর্মহীন হয়েছেন। নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন। তাঁরা বেকারত্বের সমস্যায় আক্রান্ত।
রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ৩৮টি আদিবাসী জাতির প্রায় ১৫ লাখ মানুষের বসবাস। যাদের মধ্যে সাঁওতাল, ওঁরাও, মুণ্ডা, মাহাতো, মালো, ভুনজার, মাহালি, মুষহর, তুরি, কোচ, লোহার প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। অতি প্রান্তিক ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থান করে এবং তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা অবস্থা নাজুক।  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তাদের সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে অর্থের অভাবে।
এসব জাতিসত্তার ৯০ শতাংশ মানুষই ভূমিহীন। যাদের জীবন চলে দিনমজুরির টাকায়। ফলে চলমান লকডাউন পরিস্থিতিতে তাঁরা হয়ে পড়েছেন কর্মহীন। এসব অঞ্চলেও আদিবাসীরা মহাজনদের নিকট থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে খাদ্য সংকট মোকাবেলা করছে। কিন্তু এ অবস্থা দীর্ঘদিন চললে এরা নিঃস্ব ও অসহায় হয়ে পড়বে। আমাদের সংবিধানে বলা আছে, রাষ্ট্রের প্রধান মৌলিক দায়িত্ব হলো অনগ্রসর জনগণকে তাদের শোষণ থেকে মুক্ত করা। রাষ্ট্র তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। কিন্তু স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও রাষ্ট্র কি তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পেরেছে? অদিবাসীদের সনাতনী জীবন প্রথা, আচার, ধর্ম, উৎসব, অভ্যাস ইত্যাদির ঐতিহ্যগত বৈচিত্রতা হারানোর পথে কারণ সমাজে সংখ্যাগুরুদের কটাক্ষ, বৈষম্য ও ঘৃণার শিকার প্রতিনিয়ত হচ্ছে।
ভূমি দখলের মধ্য দিয়ে সমতলের আদিবাসীদের সর্বহারা করে দেওয়া হচ্ছে।সমতলের আদিবাসীদের জমির মালিকানা প্রচলিত ভূমি রেজিস্ট্রেশন নীতিমালার আওতায় নির্ধারণ করা হয়৷ দলিল, পর্চা, নামজারি সবই প্রযোজ্য৷ কিন্তু তাদেরও কৌশলে উৎখাত করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া কত দিন চলবে এর শেষ কোথায়? আইনের সমঅধিকার রাষ্ট্রের প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার আছে ফলে জমির জাল কাগজ-পত্র, গায়ের জোর, ভয় আর প্রতারণার মাধ্যমে তাদের উৎখাত যারা করছেন তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
দরিদ্র ও প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা যাতে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম থেকে ঝরে না পড়ে, তার জন্য আর্থিক সহায়তাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।আয় রোজগার হারিয়ে অভাব অনটনে বিপর্যস্ত, তার সঙ্গে এনজিও এবং মহাজনী ঋণের কিস্তি আদায়ের নামে নানা মুখী হয়রানি শিকার হচ্ছে। তাদের জীবন নিয়ে তারা শঙ্কিত। তাই করোনাকালে পাহাড় ও সমতলে জাতিসত্তার মানুষের  খাদ্যসামগ্রী, নগদ অর্থ, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বৈষম্যের  যাতাকল থেকে বেড়িয়ে আসার সুযোগ দিতে হবে।
লেখক: রাশেদ ইসলাম, শিক্ষার্থী, জয়পুরহাট সরকারি কলেজ।