নৌপথে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা চাই

ঝালকাঠিতে লঞ্চে ভয়াবহ অগ্নি দুর্ঘটনা যতটা না আমাদের বেদনাতুর করেছে, তার চেয়ে বেশি হতাশ, ক্ষুব্ধ এবং উদ্বিগ্ন করছে। মাঝ নদীতে লঞ্চে এমন ভয়াবহ অগ্নি দুর্ঘটনা দেশের ইতিহাসে এটাই প্রথম। চলন্ত লঞ্চে অঙ্গার হয়ে একসঙ্গে এত মৃত্যু বাংলাদেশের ইতিহাসে আগে কখনও দেখেনি। যাতায়াতের সবচেয়ে সহজ, নিরাপদ ও আরামদায়ক নৌপথ। কিন্তু নৌপথ হোক আর সড়ক পথ হোক কোনো পথেই মানুষের নিরাপত্তা নেই! শুক্রবার ঝালকাঠির পোনাবালীয়া ইউনিয়নের দেউরী এলাকায় ঢাকা থেকে বরগুনাগামী এমভি অভিযান-১০ নামের লঞ্চে আগুন লাগে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত যাত্রীদের আহাজারি কান্নাস্বরে বলছে লঞ্চটির অব্যবস্থাপনার চিত্র। সেই সাথে আগুনের সূত্রপাতের সময় লঞ্চটির কর্মীদের অবহেলা ও অসহযোগিতার বিষয়ও স্পষ্ট হয়েছে। লঞ্চটিতে আগুন লাগার পরপরই এটি তীরে না ভিড়িয়ে  কেন চালিয়ে নেওয়া হল? অধিক সংখ্যক হতাহতের দায় লঞ্চ কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না। ওই লঞ্চে ধারণক্ষমতার প্রায় তিন গুণ যাত্রী নেওয়া হয়েছে। আগুন লাগার পরও যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে না দেখে লঞ্চটি বেপরোয়া গতিতে চালক কেন চালালেন? সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায় লঞ্চটির মালিক অন্তত কুড়িটি অগ্নিনির্বাপক থাকার দাবি করলেও মেলেনি একটিও। ফায়ার স্টেশনের কাছে খবর পৌঁছানো হয় ৩.২৮ মিনিটে। ফায়ার স্টেশনের কতৃপক্ষ কেন  যথা সময়ে পৌঁছাতে পারে নি? বাড়ি, দোকানপাট ও কারখানায় আগুন লাগলে মানুষ আশেপাশে পানি খুঁজার চেষ্টা করে কারণ পানি আগুন নিভাতে সহযোগিতা করে কিন্তু দুঃখের বিষয় লঞ্চটি পানির উপর ভেসে থাকলেও সেই পানি দিয়ে আগুন নিভাতে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি ফুটে উঠেছে। কিন্তু এর মধ্যে ৪০ জন আগুনে ঝালসে মারা যায়। এছাড়া ৭০ জনের বেশি দগ্ধ যাত্রী মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে ঝালকাঠি সদর হাসপাতাল ও বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এত মানুষ আহত, নিহত ও নিখোঁজ এর জন্য দায়ী কে? ইতোমধ্যে এমভি অভিযান-১০ এর যাত্রীদের আহাজারি কান্নায় বলে দিচ্ছে এর সম্পন্ন দায়ভার কতৃপক্ষের। আগুন লাগার পর লঞ্চ কর্মচারীরা যাত্রীদের রক্ষায় এগিয়ে আসেননি। কোনো যাত্রীকে লাইফ জ্যাকেট দেওয়া হয়নি। লঞ্চে ছিল না আগুন নেভানোর কোনো সরঞ্জাম। গবেষকদের তথ্য মতে আমাদের দেশে গত ৩০ বছরে সংঘটিত নৌ-দুর্ঘটনায় চারশ থেকে পাঁচশ তদন্ত কমিটি হয়েছে। তাহলে স্বাভাবিক ভাবে প্রশ্ন আসে তদন্ত কমিটির কাজ কী সঠিক ভাবে হচ্ছে? যদি সঠিক ভাবে হয়ে থাকে ঝালকাঠিতে মৃত্যুর মিছিল দেখতে হত না! জমা দেওয়া রিপোর্টে সব সময় সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত থাকে। সেগুলো যদি সঠিক সময়ে ঠিকমতো বাস্তবায়ন হতো, তাহলে এই দুর্ঘটনা বাংলাদেশের মানুষকে দেখতে হত না। এর দায় তদন্ত কমিটি এড়াতে পারেন না। বিগত বছর গুলোতে নৌ পথের দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাব ২০১৪ সালের ৪ আগস্ট মাওয়ায় পদ্মা নদীতে সংঘটিত আলোচিত যাত্রীবাহী লঞ্চ ‘এমএল পিনাকী-৬’ ডুবে যায়। আড়াই শতাধিক যাত্রী নিয়ে নদীতে ডুবে যাওয়া লঞ্চটির ধ্বংসাবশেষও মেলেনি অভিযান চালিয়ে। এ সময় ৪৯ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছিল। ২০১৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ায় পদ্মা নদীতে যাত্রীবাহী লঞ্চ ‘এমভি মোস্তফা’র দুর্ঘটনায় ৭০ যাত্রী নিহত হন। তখন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে কয়েকজনকে দায়ী করার পাশাপাশি ২৪টি সুপারিশ করা হয়। সেগুলো আর বাস্তবায়ন হয়নি। গত বছরের ২৯ জুন রাজধানীর শ্যামবাজার এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীতে এমভি ময়ূর-২-এর আঘাতে যাত্রীবাহী লঞ্চ ‘এমএল মর্নিং বার্ড’ ডুবে গেলে ৩৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দুর্ঘটনার দিনই সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। পরে ওই বছরের ৭ জুলাই কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ করেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। প্রতিবেদনে ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনা এড়াতে তদন্ত কমিটি ২০ দফা সুপারিশ করে। এসব সুপারিশে সদরঘাটের আশপাশ থেকে অলস বার্দিং, শিপইয়ার্ড, ডকইয়ার্ড ও খেয়াঘাট স্থ্থানান্তর; নৌ-দুর্ঘটনার কারণ উদ্ঘাটনে দায়ী মাস্টার-ইঞ্জিন ড্রাইভারদের সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তারসহ নৌ-পুলিশের জনবল বৃদ্ধি; নৌ-আইন অমান্যকারীদের শাস্তির মেয়াদ ও জরিমানার পরিমাণ যুগোপযোগী করে আইন সংশোধন এবং নৌ-কর্মীদের প্রশিক্ষণ ফলপ্রসূ করার উদ্যোগ গ্রহণসহ বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে ‘আইনি তদন্তের স্বার্থে’ দুর্ঘটনার কারণ প্রকাশ করা হয়নি। এক বছরেও এসব সুপারিশের বেশিরভাগ বাস্তায়ন হয়নি। ঝালকাঠি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আলাদা তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর তদন্ত কী পূর্বের তদন্ত কমিটির মতো হবে? এছাড়াও বিদ্যমান আইনে ফিটনেস সার্টিফিকেট ছাড়া যাত্রী পরিবহন করা, প্রশিক্ষিত চালক বা ইঞ্জিনিয়ার ব্যতীত জাহাজ চালানো অথবা ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল বহন করার জন্য যে ধরনের শাস্তির পরিমাণ নির্ধারণ করা আছে তা অত্যন্ত অপ্রতুল। লঞ্চ মালিকসহ ২৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অপরাধী পার পেলে এ ধরনের মর্মন্তুদ ঘটনা ঘটতেই থাকবে। ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন করার শাস্তি হিসেবে (‘দি ইনল্যান্ড শিপিং অর্ডিন্যান্স– ১৯৭৬’ ধারা ৬৬-৬৭ অনুযায়ী) দুই থেকে তিন বছর জেল এবং পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানার বিধান নিছক ঠাট্টা। অনেক সময় প্রকৃত চালকের পরিবর্তে অদক্ষ চালক লঞ্চ চালান। এর ফলে ঘন ঘন নৌ-দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। নৌ-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড, বিআইডব্লিউটিএর সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন। ত্রুটিপূর্ণ, সার্ভেবিহীন ও অনিবন্ধিত লঞ্চসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধে নৌপরিবহণ অধিদপ্তর ও বিআইডব্লিউটিএ-র নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। লঞ্চের চালক ও স্টাফদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় লঞ্চ চলাচল বন্ধ রাখতে হবে। সার্ভেয়ারের সংখ্যা অবশ্যই বাড়াতে হবে। সি-সার্ভে সনদ ছাড়া যাতে কোনো নৌযান চলাচল করতে না-পারে, সে জন্য নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হবে। পরিবহন মালিকদের গাফিলতির কারণে দুর্ঘটনা ঘটা বন্ধ করতে হলে কঠোর শাস্তির বিধান করতে হবে। শুধু আইন বা নীতিমালা তৈরিতে সীমাবদ্ধ থাকলেই চলবে না। তার প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়িদের বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। নিহত আহতদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
লেখক: রাশেদুজ্জামান রাশেদ
প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।