স্থানীয় অর্থনীতি কমাতে পারে অস্থিতিশীল বিশ্বায়িত অর্থনীতির নির্ভরতা

:

২১ জুন বিশ্ব স্থানীয়করণ দিবস। বিশ্বব্যাপী খন্ড খণ্ড আন্দোলনের ফসল আজকের বিশ্ব স্থানীয়করণ দিবস। সমগ্র বিশ্ব যেখানে গ্লোবালাইজেশনের সুফলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ সেখানে স্থানীয়করণের বিষয়টি অর্থনীতির জন্য কত গুরুত্বপূর্ণ সেটা বিবেচনার দাবি রাখে। একদিকে বিশ্বায়ন যেখানে সম্প্রদায় ওঠবা দেশসমূহের মধ্যে পণ্য ও সেবার অবাধ চলাচলকে নিশ্চিত করে, অন্যদিকে স্থানীয়করণ স্থানীয় সংস্কৃতি ও ব্যবসায়ের প্রচার এবং আরও স্বনির্ভর হওয়ার উপর জোর দেয়। বিশ্বায়নের ফলে বড় বড় কোম্পানিগুলো আরো ক্ষমতাশীল হয়ে উঠছে যার ফলে স্থানীয় দেশি ক্ষুদ্র শিল্পদ্যোক্তারা হুমকির মুখে পড়ছে। বাংলাদেশে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বর্তমানে সরকারকে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করছে তাদের সহায়তা করতে। সরকার বৈদেশিক বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করতে আগ্রহী, ফলস্বরূপ বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের সুবিধা আদায়ের মাধ্যমে মুনাফার হারকে বৃদ্ধি করার সুযোগ পাচ্ছে। অপরদিকে সাধারণ কৃষক ও নতুন উদ্যোক্তারা নিয়মের বেড়াজালে আটকে তাদের নিজেদের অবস্থানকে শক্ত করতে পারছে না। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি গ্রামীণফোন বিটিআরসির পাওনা দুই হাজার কোটি টাকা বকেয়া থাকার পরও দাপটের সাথে ব্যবসা করে যাচ্ছে, যার প্রভাব দেশিয় অর্থনীতির উপর পড়ছে। বিশ্বায়নের এরুপ আগ্রাসন থেকে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উত্তরণের জন্য ও আঞ্চলিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে তৃণমূল পর্যায়ে উদ্যোক্তারা বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছেন, যার লক্ষ্য স্থিতিশীল স্থানীয় বাণিজ্য গোষ্ঠী গড়ে তোলা। এর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় মুদ্রার প্রচলন, স্থানীয় ক্রয়মূলক প্রচারণা, কৃষকের বাজার, সম্প্রদায় ভিত্তিক চাষাবাদ, স্থানীয় সমবায় ভিত্তিক ব্যবসা এবং অন্যান্য। এই জাতীয় উদ্যোগগুলো সারা বিশ্ব জুড়ে স্থানীয়ভাবে নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়করণ আন্দোলনটি ভৌগলিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবে দুর্ভাগ্যক্রমে, এটি অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় অর্থনীতির প্রসার ঘটাতে সফল হয় নি। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর শক্ত অবস্থান ও প্রক্রিয়াজাত বিদেশি পণ্যের প্রতি ভোক্তাদের আকর্ষণ এর জন্য দায়ী বলে মনে করছেন এ আন্দোলনের নেতারা। তাদের দাবি,স্থানীয়করণের উদ্যোগের অন্তর্নিহিত লক্ষ্য হল অস্থিতিশীল বিশ্বায়িত অর্থনীতির উপর ন্যূনতম নির্ভরতা সহ একটি কার্যকর স্থানীয় উপ-অর্থনীতি তৈরি করা।
বিশ্বায়নের প্রভাব শুধু অর্থনীতির উপর নয়, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণের ক্ষেত্রেও বিশ্বায়নের প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। ব্রেক ফ্রি ফ্রম প্লাস্টিক মুভমেন্টের এক সমীক্ষায় পাওয়া তথ্যমতে সমগ্র বিশ্বে প্লাস্টিক দূষণে শীর্ষে রয়েছে কোকাকোলা, নেসলে ও পেপসিকোর মত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান।
স্থানীয়করণ আন্দোলনের নেত্রী ডক্টর বন্দনা শিবার মতে, আমাদের মোট খাদ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ আসে ছোট ছোট আঞ্চলিক খামার থেকে এবং বাকি প্রায় ৩০ শতাংশ আসে দেশি বিদেশি শিল্পকারখানা থেকে। কিন্তু এই ৩০ শতাংশ খাদ্য সরবরাহ করতে গিয়ে তারা প্রায় ৭০ শতাংশ পরিবেশ দূষণ করছে। গ্রিন হাউজ গ্যাসের প্রায় ৪০ শতাংশই আসে এ সকল শিল্পকারখানা থেকে। তাই দেশি বিদেশি কোম্পানির পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য গ্রহনের প্রতি তিনি ভোক্তাদের আগ্রহী হতে পরামর্শ দেন।
পরিবেশ দূষণের জন্য কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো অনেকাংশে দায়ী। সমগ্র বিশ্বের মোট কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর প্রায় ৪০ শতাংশই চীনে অবস্থিত। যদিও চীন এখন কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে সরে সৌর বিদ্যুতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে কিন্তু ভয়ংকর তথ্য হচ্ছে চীন ৬৪টি দেশে প্রায় ২৪০টি তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করছে। অর্থাৎ পরিবেশবাদীদের দাবীকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে তারা শুধু মুনাফার হিসাব কষছে।
পরিবেশ ও অর্থনীতির এ সকল বিষয়কে সামনে এনে পৃথিবীব্যাপী যখন স্থানীয়করণ আন্দোলন শুরু হয়েছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তখন তাদের বিজ্ঞাপণগুলোকে স্থানীয়করণ করছে, ফলে স্থানীয় ভোক্তা সাধারণ একটা কুয়াশাচ্ছন্ন অবস্থায় থেকে যাচ্ছে। আমাদের দেশের বিজ্ঞাপণগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানিগুলো তাদের বিজ্ঞাপণে যে পরিমাণ দেশপ্রেম দেখিয়েছে এতটা দেশপ্রেম বাংলাদেশ আগে কোন বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপণে দেখেনি। তাই দেশীয় অর্থনীতির ভীতকে মজবুত করতে প্রয়োজন স্থানীয় শিল্প ও উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া।
এক্ষেত্রে শুধু সরকারকে দোষারোপ করলে হবে না। সরকারের একার পক্ষে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে ভোক্তা সাধারণকেও এগিয়ে আসতে হবে। বহুজাতিক কোম্পানি কতৃক প্রক্রিয়াজাত পণ্যের পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের প্রতি আগ্রহী হতে হবে। সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে দেশীয় স্থানীক অর্থনীতিকে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে।

লেখকঃ
নাজমুস সাকিব
জেলা টিম লিডার
ক্লাইমেট ফিন্যান্স ট্রান্সপারেন্সি মেকানিজম প্রজেক্ট
কোস্ট ট্রাস্ট