সদরঘাট লঞ্চডুবির ঘটনায় বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা

শাহিন আহম্মেদ, কেরানীগঞ্জ, (ঢাকা) প্রতিনিধি :

লঞ্চডুবির ঘটনায় বাড়ছে লাশের মিছিল। নিহতের স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠে এলাকার পরিবেশ। যতই সময় গড়াছে নদীতে ভেসে উঠছে একের পর এক লাশ।

জানা গেছে, সকাল ৯টার দিকে মুন্সিগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা দোতলা মর্নিং বার্ড লঞ্চটি সদরঘাট কাঠপট্টি ঘাটে ভেড়ানোর আগ মুহূর্তে চাঁদপুরগামী ময়ূর-২ লঞ্চটি ধাক্কা দেয়।

বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক ঢাকা নদী বন্দর কর্মকর্তা একেএম আরিফ উদ্দিন বলেন, মর্নিং বার্ড লঞ্চটি সকাল ৯ টার দিকে সদরঘাটে বার্দিং (নোঙ্গর) করার আগ মুহূর্তে চাঁদপুরগামী ময়ূর-২ লঞ্চটি ধাক্কা দেয়। এতে সঙ্গে সঙ্গে তুলনামূলক ছোট মর্নিং বার্ড লঞ্চটি ডুবে যায়। এ সময় লঞ্চটিতে কমপক্ষে অর্ধশতাধিক যাত্রী ছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের মধ্যে কয়েকজন সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও অনেকেই ভেতরে আটকা পড়েন। তবে ঠিক কতজন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়। তিনি জানান, ঘটনার পর পরই ময়ূর লঞ্চটি আটক করা হয়েছে।

তবে স্থানীয়দের দাবি, লঞ্চে শতাধিক যাত্রী ছিল। যা ধারণ ক্ষমতার অধিক। এছাড়া ছোট এ লঞ্চটি দীর্ঘ দিনের পুরানো এবং ফিটনেস নেই। ময়ূর লঞ্চটি নির্মাণেও ত্রুটি রয়েছে।

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ও কোস্ট গার্ড। পরে উদ্ধার কাজে যোগ দেয় নৌবাহিনী। এছাড়া নৌপুলিশ এবং বিআইডব্লিউটিএর নিজস্ব ডুবুরি দল এবং স্থানীয় লোকজন উদ্ধারকাজে অংশ নেয়।

উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা জানান, যেখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে, তার কাছাকাছি এলাকায় নদীর মাঝখানে ডুবে যাওয়া লঞ্চটি শনাক্ত করা হয়েছে। ভেতরে আর কারও লাশ আছে কি না, তা তল্লাশি করে দেখা হচ্ছে। ডুবুরিরা দেখেছেন লঞ্চটির ভেতর আরও মৃতদেহ রয়েছে। তবে তা উদ্ধার কঠিন হয়ে পড়েছে। কেননা, লঞ্চটি উপুড় হয়ে থাকার কারণে ভেতরে ঢোকা যাচ্ছে না।

সোমবার বিকাল সোয়া ৫টায় এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত নারী-শিশুসহ ৩২ জনের লাশ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা।

কোস্ট গার্ড সদর দফতরের মিডিয়া উইং এর কর্মকর্তা লেঃ কমান্ডার হায়াৎ ইবনে সিদ্দিক ও ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন ম্যানেজার শহীদুল ইসলাম সুমন জানান, এখন পর্যন্ত ৩২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুইজন শিশু, পাঁচ জন নারী, ২৫ জন পুরুষ। তারা বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সন্দেহ থাকবে এখনও মরদেহ থাকতে পারে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোস্ট গার্ডের উদ্ধার অভিযান চলবে। প্রায় ৬০-৭০ ফুট পানীর তলদেশে লঞ্চটি কাত হয়ে স্থিতিশীল রয়েছে। আমাদের সঙ্গে নৌপুলিশ, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, বিআইডব্লিউটি ও থানা পুলিশ কাজ করছে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের পরিচালক মো. শাহজাহান বলেন, ডুবে যাওয়া লঞ্চটি উদ্ধারে সংস্থার নিজস্ব উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয় নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দর থেকে সকাল ১১ টায় রওয়ানা দিয়েছে। তবে এ রিপোর্ট রাত ৯টায় লেখা পর্যন্ত উদ্ধারকারী জাহাজটি ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছায়নি।

শ্যামবাজার ও মিডফোর্টে কান্নার রোল : দুর্ঘটনার পর হাজার হাজার মানুষ ঘাটে এসে ভিড় করেন। খবর পেয়ে শ্যামবাজার এলাকায় ছুটে আসেন যাত্রীদের স্বজনরা। কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। তাদের আহাজারিতে বুড়িগঙ্গার বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। লঞ্চ দুর্ঘটনায় নদী তীরে ভিড় জমানো লোকজনের মাঝেও নেমে আসে শোকের ছায়া। নিখোঁজ যাত্রীদের খোঁজে ঘাটে আসা স্বাজনদের বিলাপ করতে দেখা যায়। অনেক স্বজনকে দেখা যায় নদীতে সাঁতার দিয়ে ঘটনাস্থলে যাওয়ারও চেষ্টা করতে। পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশসহ অভিযান পরিচালনা বাহিনীকে হিমশিম খেতে হয়।